ডেস্ক রিপোর্ট: অবশেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদের ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ বাতিল করা হয়েছে। নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের ঠিক এক দিন আগে গতকাল সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) তড়িঘড়ি করে বিতর্কিত ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার লক্ষ্যে জরুরি পর্ষদ সভা আহ্বান করেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। কিন্তু পর্ষদ সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে এই মুহূর্তে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগটি স্থগিত রাখা হয়েছে।
দেশে নতুন সরকার গঠনের ক্রান্তিকালে জরুরি ভিত্তিতে এ ধরনের লাইসেন্স বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তাই সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) এই ধরনের পদক্ষেপের প্রতিবাদ জানিয়ে লাইসেন্স স্থগিতের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। এই বিষয়ে দৈনিক খবরের কাগজে সোমবার ‘বিতর্কিত ডিজিটাল ব্যাংক: লাইসেন্স দিতে তড়িঘড়ি সভা আহ্বান গভর্নরের’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়েছে।
আগের গভর্নরের সময় ডিজিটাল ব্যাংক চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থগিত হয়
এর আগে, স্থাপনাবিহীন ইন্টারনেট ও অ্যাপ-নির্ভর ডিজিটাল ব্যাংক আগের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার চালু করার উদ্যোগ নিলেও রাজনৈতিক প্রভাব এবং পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে তা আটকে যায়। ওই সময় অর্থাৎ, ২০২৩ সালের ১৪ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংকের একটি নীতিমালাও প্রণয়ন করেছিল। নীতিমালা অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন হবে ৩০০ কোটি টাকা। এটির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য শুধু প্রধান কার্যালয় থাকবে। তবে সেবা প্রদানের জন্য কোনো কার্যালয় থাকবে না। অর্থাৎ এই ব্যাংক কোনো ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) বা বুথ বসিয়ে সেবা দেবে না। ডিজিটাল ব্যাংকের নিজস্ব কোনো শাখা বা উপশাখা, এটিএম, সিডিএম অথবা সিআরএমও থাকবে না। সব সেবাই দেওয়া হবে অ্যাপস, মুঠোফোন বা ডিজিটাল যন্ত্রের মাধ্যমে।
ডিজিটাল ব্যাংকে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই সেবা মিলবে। গ্রাহকদের লেনদেনের সুবিধার্থে এই ব্যাংক ভার্চ্যুয়াল কার্ড, কিউআর কোড ও অন্য কোনো উন্নত প্রযুক্তিভিত্তিক পণ্য চালু করতে পারবে। তবে লেনদেনের জন্য কোনো প্লাস্টিক কার্ড দিতে পারবে না। এই ব্যাংকের সেবা নিতে গ্রাহকরা অন্য ব্যাংকের এটিএম, এজেন্টসহ নানা সেবা ব্যবহার করতে পারবেন। তবে ডিজিটাল ব্যাংক কোনো ঋণপত্র (এলসি) খুলতে এবং বড় ও মাঝারি শিল্পে কোনো ঋণ দিতে পারবে না। শুধু ছোট ঋণ দিতে পারবে।
ডিজিটাল ব্যাংক নিয়ে আহসান মনসুরের নতুন উদ্যোগ
গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আহসান এইচ মনসুর নতুন গভর্নরের দায়িত্ব নেন। এরপর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নতুনভাবে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আবেদন চাওয়ার পর ১২টি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য আবেদন করেছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিদেশি অংশীদারত্ব আছে। আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এমন প্রতিষ্ঠানও আছে যাদের অন্য দেশে ডিজিটাল ব্যাংক পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১২টি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের জন্য আবেদন করেছে। এগুলো হলো–ব্রিটিশ বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি, ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান-ডিকে, আমার ডিজিটাল ব্যাংক-২২ এমএফআই, ৩৬ ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি, বুস্ট-রবি, আমার ব্যাংক, অ্যাপ ব্যাংক-ফার্মারস, নোভা ডিজিটাল ব্যাংক-বাংলালিংক অ্যান্ড স্কয়ার, মৈত্রী ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি, উপকারী ডিজিটাল ব্যাংক, মুনাফা ইসলামী ডিজিটাল ব্যাংক-আকিজ এবং বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক।
যে কারণে বিতর্কিত ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স
কাউন্সিলের সভাপতি মাসুম বিল্লাহ বলেন, আমাদের আপত্তি লাইসেন্স দেওয়া নিয়ে নয়, বরং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে গেলে সরকারের অনাপত্তি লাগে। আমরা যতটুকু জানি, সরকার এখন পর্যন্ত সেই অনুমোদন দেয়নি। এ ছাড়া বিকাশের মাধ্যমে ব্র্যাক ব্যাংককে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার যে চেষ্টা চলছে, তাতে একটি মনোপলি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ব্র্যাক ব্যাংক নিজেই একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক, আবার বিকাশকেও তারা ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। গভর্নর নিজেও একসময় সেই ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে এ ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের প্রশ্ন পর্ষদ সভা ডাকা নিয়ে নয়, বরং এমন একটি গ্রুপকে সুবিধা দেওয়ার জন্য এই তড়িঘড়ি করে পর্ষদ সভা ডাকা হয়েছে, যাদের সঙ্গে বর্তমান কর্তৃপক্ষের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে যখন প্রধান অর্থ উপদেষ্টা বিদায় নিচ্ছেন এবং নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, তখন কেন এত তাড়াহুড়া?
বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর স্বৈরশাসন কায়েম করেছেন বলে অভিযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর স্বৈরশাসন কায়েম করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের নেতারা। তারা বলেন, আহসান এইচ মনসুর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মিত পদোন্নতি বন্ধ হয়ে গেছে। নির্বাহী পরিচালক পদ খালি হলেও সেখানে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ্য ও দক্ষ জনবল থাকা সত্ত্বেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে বাইরে থেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
গতকাল সকালে বিতর্কিত ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স স্থগিতের দাবিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কাউন্সিলের নেতারা এসব কথা বলেন। এ সময় তারা গভর্নরের স্বেচ্ছাচারমূলক আচরণের সমালোচনা করেন। তারা বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ্য ও দক্ষ জনবল থাকা সত্ত্বেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে বাইরে থেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যাদের যোগ্যতা এবং কর্ম পর্যালোচনা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকে অসংখ্য সৎ, যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তা আছেন, কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা তাদের যোগ্য নেতৃত্ব ও সঠিক গাইডেন্স দিতে পারছি না। আমরা আশা করেছিলাম বর্তমান গভর্নরের কাছ থেকে অনেক কিছু পাব, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।’ তারা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনি কাঠামো অনুযায়ী, গভর্নর কোনো সিদ্ধান্ত নিলে আইনিভাবে কিছু বলার এখতিয়ার কারও নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারে যে ক্ষমতা দেওয়া আছে, তাতে গভর্নর এককভাবে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। অর্থাৎ স্বৈরাচারী হতে চাইলে সেটা অসম্ভব কিছু না। বর্তমান গভর্নর স্বায়ত্তশাসনের কথা বলে তিনি নিজেই একনায়ক বা স্বৈরশাসকের মতো আচরণ করছেন বলেও তারা অভিযোগ করে বলেন, ‘গভর্নরের এমন আচরণের জন্যই আজ আমরা সংবাদ সম্মেলন করার তাগিদ অনুভব করছি।’ সংবাদ সম্মেলনে পরিচালক নওশাদ মোস্তফা বলেন, ‘আমরা স্বায়ত্তশাসন চাই প্রতিষ্ঠানের জন্য, কোনো ব্যক্তির জন্য নয়। স্বায়ত্তশাসন মানে এই নয় যে প্রতিষ্ঠানের প্রধান একজন একনায়ক বা স্বৈরাচারী হয়ে উঠবেন।’
কৌশলে গভর্নরের পদত্যাগ চাইলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, ‘গভর্নরের পদত্যাগ চাই কি না, তা একটি বড় প্রশ্ন। নতুন সরকার তাদের মতো করে দেখবেন। তবে আমরা মনে করি, একজন ব্যক্তির পরিবর্তনই আসলে সমাধান নয়। তবে নেতৃত্বের পরিবর্তন যদি স্বৈরাচারিতা দূর করে স্বচ্ছতা ও পেশাদারত্ব ফিরিয়ে আনে তবে তা অবশ্যই প্রয়োজন। আমাদের এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন যিনি আমানতকারীদের মনে ভয় না জাগিয়ে আস্থা ফিরিয়ে আনবেন এবং যিনি একক সিদ্ধান্তে নয় বরং সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিমের মতামতের ভিত্তিতে সংস্কারকাজ করবেন। আমরা অবশ্যই সংস্কারের পক্ষে।’
সূত্র: খবরের কাগজ