ভূমিধস জয়ে ক্ষমতা আরও শক্ত করলেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি

প্রকাশিত: ৯:২৮ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৯, ২০২৬

ডেস্ক রিপোর্ট: জাপানে রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন জোট। এই জয়ে নিজের ক্ষমতা আরও শক্ত করলেন তাকাইচি।

তাকাইচি জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ‘আয়রন লেডি’ মার্গারেট থ্যাচার তাঁর অনুপ্রেরণা। নির্বাচনের প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, তাকাইচির দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) সংসদের নিম্নকক্ষের ৪৬৫টি আসনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩২৮টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার দুই ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে এলডিপি এককভাবে ২৩৩ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়িয়ে যায়, যা দলটির ইতিহাসের অন্যতম সেরা নির্বাচনী ফল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জোটসঙ্গী জাপান ইনোভেশন পার্টি (ইশিন)-কে সঙ্গে নিয়ে তাকাইচির জোট এখন দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনের ‘সুপার মেজরিটি’ অর্জন করেছে। এর ফলে উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও আইন প্রণয়নে বাধা কাটিয়ে উঠতে পারবেন তিনি।

ফল প্রকাশের সময় এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তাকাইচি বলেন, ‘এই নির্বাচনে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের বিষয় ছিল—বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও রাজস্ব নীতিতে এবং নিরাপত্তা জোরদারের ক্ষেত্রে। এসব নীতির বিরুদ্ধে অনেক বিরোধিতা ছিল। জনগণের সমর্থন পেয়ে থাকলে আমাদের অবশ্যই সর্বশক্তি দিয়ে এসব ইস্যু মোকাবিলা করতে হবে।’

৬৪ বছর বয়সী তাকাইচি গত বছরের শেষ দিকে দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন এলডিপির নেতৃত্ব পাওয়ার পর নিজের জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে এই বিরল শীতকালীন নির্বাচন আহ্বান করেন। তাঁর সোজাসাপ্টা কথা বলা ও পরিশ্রমী ভাবমূর্তি ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে। তবে তাঁর জাতীয়তাবাদী অবস্থান ও নিরাপত্তা ইস্যুতে জোর দেওয়ায় চীনের সঙ্গে জাপানের সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়েছে। পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের ওপর ৮ শতাংশ বিক্রয় কর স্থগিত করার প্রতিশ্রুতি আর্থিক বাজারকে অস্থির করে তুলেছে।

রোববার তুষারঝড়ের মধ্যেই ভোট দেন অনেকে। কোথাও কোথাও রেকর্ড পরিমাণ তুষারপাতের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং কিছু ভোটকেন্দ্র আগেভাগে বন্ধ করতে হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফেব্রুয়ারিতে এটি ছিল মাত্র তৃতীয় জাতীয় নির্বাচন। সাধারণত মৃদু আবহাওয়ার সময়েই নির্বাচন হয়ে থাকে।

নিগাতা প্রদেশের পাহাড়ি শহর উওনুমার একটি ভোটকেন্দ্রের বাইরে শিক্ষক কাজুশিগে চো (৫৪) বলেন, ‘মনে হচ্ছে তিনি দেশটাকে একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন—সবাই যেন একসঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে।’

তবে মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে খাদ্যে ভোগ্যকর স্থগিতের প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে জাপানের ঋণের বোঝা সবচেয়ে বেশি—এই পরিস্থিতিতে অর্থের জোগান কীভাবে হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাকাইচি বলেন, রাজস্ব স্থিতিশীলতার দিকে নজর রেখে কর ছাড়ের বিষয়টি দ্রুত বিবেচনা করা হবে।

লন্ডনে ডাইওয়া ক্যাপিটাল মার্কেটস ইউরোপের গবেষণা প্রধান ক্রিস সিসলুনা বলেন, ‘ভোগ্যকর কমানোর পরিকল্পনায় অর্থায়ন নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে এবং হিসাব কীভাবে মেলানো হবে, তা স্পষ্ট নয়।’

জাপানের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন কেইদানরেনের প্রধান ইয়োশিনোবু সুতসুই তাকাইচির জয়কে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ‘টেকসই ও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে জাপানের অর্থনীতি এখন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে রয়েছে।’

এর আগে তাকাইচির পূর্বসূরি শিগেরু ইশিবার সময়ে গত ১৫ মাসে একাধিক নির্বাচনে এলডিপি সংসদের দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল। তাকাইচি তরুণ ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দলের ভাগ্য ঘুরিয়ে দেন। তাঁকে ঘিরে ‘সানাকাতসু’ বা ‘সানায়ে-উন্মাদনা’ও দেখা গেছে। সংসদে ব্যবহার করা তাঁর হ্যান্ডব্যাগ ও গোলাপি কলমের চাহিদা বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে তাকাইচিকে ‘পূর্ণ সমর্থন’ দেওয়ার কথা জানান এবং আগামী মাসে তাঁকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানোর কথা বলেন।

চীনও এই ফলাফল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাইওয়ানে চীনের সম্ভাব্য হামলার জবাবে টোকিও কী করতে পারে, তা প্রকাশ্যে তুলে ধরে বেইজিংয়ের সঙ্গে এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিরোধে জড়ান তাকাইচি। এর প্রতিক্রিয়ায় চীন পাল্টা পদক্ষেপ নেয়, যার মধ্যে নাগরিকদের জাপানে ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করাও ছিল।

তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে প্রথম দিকের বিদেশি নেতাদের মধ্যে তাকাইচিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, তাঁর জয় জাপান ও অঞ্চলটির জন্য আরও সমৃদ্ধ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ বয়ে আনবে বলে তিনি আশা করেন।

শক্তিশালী এই জনসমর্থন তাকাইচির প্রতিরক্ষা জোরদারের পরিকল্পনা আরও দ্রুত বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিতে পারে, যা বেইজিংকে আরও ক্ষুব্ধ করতে পারে। চীন তাঁকে জাপানের সামরিক অতীত পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা হিসেবে তুলে ধরছে।

জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি বলেন, প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার নীতি এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি চীনের সঙ্গে সংলাপও চালিয়ে যেতে চান তিনি।

এশিয়া গ্রুপের প্রধান ডেভিড বোলিং বলেন, ‘বেইজিং তাকাইচির জয়কে স্বাগত জানাবে না। চীন এখন বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য—তিনি দৃঢ়ভাবে ক্ষমতায় রয়েছেন এবং তাঁকে একঘরে করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।’

সূত্র: রয়টার্স