২৫ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ, কী বলছেন আসিফ-হাসনাত?

প্রকাশিত: ১:১০ অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০২৬

ডেস্ক রিপোর্ট: জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দলটির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়া।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সমন্বয়ের নামে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ মুরাদনগরের জন্য ১৫ কোটি টাকা ও হাসনাত আবদুল্লাহ দেবিদ্বারের জন্য ১০ কোটি টাকা কুমিল্লা জেলা পরিষদ থেকে নিয়েছেন।

শনিবার (৩০ মে) কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমিতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মোস্তাক মিয়া এসব কথা বলেন।

তবে অভিযোগটি প্রত্যাখ্যান করেছেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, দেবিদ্বার উপজেলায় উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ওই অর্থ বরাদ্দ ছিল। জেলা পরিষদের প্রশাসক যে টাকার কথা বলেছেন, তা ওই উপজেলার বাজেট বরাদ্দ ছিল। এটি স্থানীয় সরকার বিভাগের বিশেষ বরাদ্দ, যা জেলা পরিষদের মাধ্যমে ব্যয় করা হয়েছে। এটি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে দেওয়া হয়নি।

হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক তার বক্তব্য পরিবর্তন করেছেন। ‘হাসনাত ব্যক্তিগতভাবে টাকা নিয়েছেন’—এমন কথা বলেননি বলে জানিয়েছেন।

এদিকে হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গে এক ফোনালাপে মোস্তাক মিয়াকে বলতে শোনা যায়, ‘জেলা পরিষদের মাধ্যমে ওই টাকা আপনার এলাকার উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা হয়েছে।’

মোস্তাক মিয়া বলেন, ‘না, না, রাজস্ব তহবিল থেকে নয়, সব তহবিল মিলিয়ে টাকাটা আমার জেলা পরিষদের মাধ্যমে আপনাদের এলাকায় গেছে।’

‘আমি বলতে চেয়েছি, আপনারা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করেছেন। এখন আপনার উপজেলায় গেছে ১০ কোটি। আর ওইখানে গেছে ১৫ কোটি। আপনি টাকা খাইছেন এটা আমি বলি নাই। আমি বলেছি, আপনারা (হাসনাত ও আসিফ) দুই উপজেলায় উন্নয়ন কাজের জন্য ২৫ কোটি টাকা নিয়েছেন।’

মোস্তাক বলেন, আমার বক্তব্যের পুরো অংশ হয়তো গণমাধ্যমে আসেনি।

মোস্তাক আবারও বলেন, আমি আপনার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলিনি। আমি বলিনি আপনি (হাসনাত) টাকা আত্মসাৎ করেছেন। আমি বলেছি, আপনার এলাকায় কাজের জন্য আপনি নিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মোস্তাক মিয়া বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসনাত বলেন, দেবিদ্বারে ৪২টি উন্নয়ন কাজের জন্য ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এই টাকা এডিপি প্রকল্পের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিলের কোনো সম্পর্ক নেই।

তিনি বলেন, রাজস্ব তহবিল ও বিশেষ বরাদ্দের পার্থক্য বুঝলে জেলা পরিষদের প্রশাসক এমন মন্তব্য করতেন না।

‘তিনি এমনভাবে কথা বলেছেন যেন আমরা নিজেরাই টাকা আত্মসাৎ করেছি। বাস্তবে দেবিদ্বারের বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল’, হাসনাত বলেন।

এনসিপির এ নেতা বলেন, এই অভিযোগ বিভ্রান্তিকর এবং জনসাধারণের অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে ভুল ধারণা তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, অর্থটি প্রকল্পভিত্তিক ছিল এবং জেলা পরিষদের সরকারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যয় করা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।

জানতে চাইলে মোস্তাক মিয়া বলেন, ওই সময়ে এডিবি ও জেলা পরিষদের বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দের অধিকাংশ অর্থ মুরাদনগর ও দেবিদ্বার উপজেলায় দেওয়া হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, অন্য উপজেলাগুলোতে খুব অল্প অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তারা নিজেরাই বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলেন, কিন্তু বাস্তবে বৈষম্যমূলক কর্মকাণ্ড করেন। মূলত এটাই আমি বোঝাতে চেয়েছি।

শনিবার (৩০ মে) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় আসিফ মাহমুদ বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে যেন তিনি ও হাসনাত ব্যক্তিগতভাবে অর্থ গ্রহণ করেছেন। অথচ বাস্তবে এটি ছিল স্থানীয় সরকার বিভাগের বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দ।

তার ভাষায়, কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সরকারি বরাদ্দকে ব্যক্তিগতভাবে টাকা নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা যেমন অযৌক্তিক, তেমনি মানহানিকরও। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় বাজেট অনুমোদনের অর্থ এই নয় যে সরকারপ্রধান ব্যক্তিগতভাবে সেই অর্থ গ্রহণ করছেন। একইভাবে কোনো এলাকায় উন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সেই অর্থ নিজের কাছে নিয়েছেন, এমন ব্যাখ্যা সঠিক নয়।

আসিফ মাহমুদ জানান, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের বাজেটের একটি অংশ ‘বিশেষ বরাদ্দ’ হিসেবে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে দেওয়া হয়। এই বরাদ্দ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা বা সচিবের অনুমোদনের মাধ্যমে আবেদন ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে দেওয়া হয়ে থাকে।

তিনি বলেন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে এসব অর্থ ব্যয় করা হয়। বরাদ্দ অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট জেলার প্রশাসক বা চেয়ারম্যানের নেতৃত্বাধীন কমিটি সিদ্ধান্ত নেয় কোন খাতে অর্থ ব্যয় হবে।

কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসকের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি দাবি করেন, রাজস্ব খাত ও বিশেষ বরাদ্দ খাতের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। রাজস্ব খাত থেকে কোনো ব্যক্তি বা এলাকার জন্য আলাদা বরাদ্দ নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, আলোচিত অর্থের ব্যয়ের সিদ্ধান্ত জেলা পরিষদের সভায় নেওয়া হয়েছে এবং সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী ই-টেন্ডারের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

নিজের বক্তব্যের পক্ষে উদাহরণ দিয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, কুমিল্লা জেলা পরিষদের সভার কার্যবিবরণীতেই দেখা যায় যে বিশেষ বরাদ্দের অর্থ সোলার লাইট স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আসবাবপত্র ক্রয়, মসজিদ সংস্কারসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে এই অর্থ ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ বা ব্যয়ের কোনো সুযোগ ছিল না।

অন্যদিকে একই বিষয়ে সরাসরি ব্যাখ্যা চান হাসনাত আব্দুল্লাহ। জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়ার সঙ্গে তার ফোনালাপের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।

ফোনালাপে হাসনাত আব্দুল্লাহ জানতে চান, তার বিরুদ্ধে ‘টাকা খাওয়ার’ অভিযোগ করা হয়েছে কি না। জবাবে মো. মোস্তাক মিয়া বলেন, ‘রাজস্ব খাতসহ সব খাত মিলিয়ে আপনার এলাকায় ১০ কোটি টাকা গেছে। আপনারা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করেছেন। আপনার উপজেলায় ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে, আর আসিফ মাহমুদের এলাকায় ১৫ কোটি টাকা গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আপনি টাকা খেয়েছেন, সেটা তো আমি বলিনি। আমি বলেছি, উন্নয়নমূলক কাজের জন্য আপনাদের দুই উপজেলায় মোট ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। হয়তো আমার বক্তব্য গণমাধ্যমে সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি।’

হাসনাত আব্দুল্লাহও দাবি করেন, আলোচিত অর্থ তার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে নয়, বরং সংশ্লিষ্ট এলাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

বিষয়টি নিয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, বরাদ্দ দেওয়া এবং অর্থ ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক তার বক্তব্য আরও পরিষ্কার করবেন। অন্যথায় বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায়ও যেতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।

ভিডিও বার্তার শেষাংশে দেশের নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, কোনো তথ্য বিশ্বাস বা প্রচার করার আগে তা যাচাই করা উচিত। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, তাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট সব তথ্য জনসম্মুখে তুলে ধরা হবে।