গ্যাস সংকট আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে! PAYRA NEWS PAYRA NEWS প্রকাশিত: ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৮, ২০২৬ ডেস্ক রিপোর্ট: আমদানি বাড়ানোর সুযোগ নেই, অন্যদিকে ধারণার চেয়ে দ্রুত গতিতে কমছে দেশীয় ফিল্ডের গ্যাস উৎপাদন। যে কারণে ২০২৭-২৮ সালে দেশে ভয়াবহ গ্যাস সংকটের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সংকট সামাল দিতে ছাতক গ্যাস ফিল্ডের উন্নয়ন, ভোলা-বরিশাল পাইপলাইন এবং ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল জরুরি বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। যদিও এসব বিকল্প থেকেও গ্যাস পেতে কমপক্ষে ২ থেকে ৫ বছর সময় প্রয়োজন পড়বে। তারপরও এসব ছাড়া আর কোন স্বল্প মেয়াদী বিকল্প পেট্রোবাংলার হাতে নেই। অন্য যেগুলো রয়েছে সেখানে সুফল পেতে ৫ থেকে ১০ বছর প্রয়োজন পড়বে। এরমধ্যে রয়েছে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, জামালপুর ও জকিগঞ্জ থেকে গ্যাস সিস্টেমে যোগকরা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এখনই ছাতক গ্যাস ফিল্ডের উন্নয়নকে অগ্রাধিক দেওয়া উচিৎ। ফিল্ডটিতে প্রমাণিত মজুদ রয়েছে, আবার সরবরাহ পাইপলাইনও প্রস্তুত। ২০০৫ সালে (৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন) দুই দফা বিস্ফোরণের পর থেকে পড়ে রয়েছে ফিল্ডটি। এতোদিন মামলার আটকা থাকলেও এখন তা কেটে গেছে। তারপরও হাত গুটিয়ে বসে থাকায় অনেকে বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন। সম্ভাবনাময় গ্যাসফিল্ডটি ফাটল থাকায় ছাতক পূর্ব ও ছাতক পশ্চিম (টেংরাটিলা) নামে বিভক্ত। অগ্নিকাণ্ডে ছাতক পশ্চিমের একটি স্তুরের গ্যাস পুড়ে যায়, অন্যান্য স্তর এবং ছাতক পূর্বের মজুদ অক্ষত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। সম্ভাব্য মজুদ ২ থেকে ৫ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট) বিবেচনা করা হয়। সেখানে গ্যাস পাওয়া গেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরবরাহ করা সম্ভব। যা আর কোন ফিল্ডে সম্ভব না। ২০২১ সালে জকিগঞ্জে গ্যাস ফিল্ড আবিস্কার হলেও এখন সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলোর মজুদ ফুরিয়ে আসছে, এতে প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে উৎপাদন। এক সময় দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ২৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতো। ২৬ এপ্রিল ১৬৬২ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। অথচ এই সময়ে দেশীয় গ্যাস ফিল্ড থেকে ১৭৭০ মিলিয়ন গ্যাস প্রাপ্তির প্রত্যাশা ছিল। যে কোন সময়ে উৎপাদনে বড় ধরণের ধ্বসের শঙ্কা দেখছেন অনেকেই। সেই ঘাটতি সামাল দেওয়ার মতো উপযুক্ত বিকল্প নেই পেট্রোবাংলার হাতে। দেশের চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতির মোকাবিলায় এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে ২০১৮ সাল থেকে। বিদ্যমান দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সর্বোচ্চ সক্ষমতা (১১০০ মিলিয়ন) ব্যবহার করা হচ্ছে। আমদানি বাড়াতে হলে নতুন ভাসমান টার্মিনাল বসাতে হবে। আর তাতে কমপক্ষে ২ বছর সময় প্রয়োজন। শুধু ভাসমান টার্মিনাল হলেও ইচ্ছেমতো আমদানি বাড়ানোর সুযোগ নেই। লাগবে আরও একটি পাইপলাইন। অর্থাৎ সহসা আমদানি বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। যে কারণে ২০২৭-২৮ সালকে বিপজ্জনক বিবেচনা করা হচ্ছে। যার জন্য এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। এখানে আন্তবর্তীকালীন সরকারের চরম অবহেলা দৃশ্যমান। তাদের বেশকিছু পদক্ষেপ গ্যাস খাতকে বিপদের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করেন অনেকেই। গত জানুয়ারি মাসে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ‘ছাতক ফিল্ডে কূপ খননের জন্য ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) প্রস্তুত রয়েছে। আমরা ইকসিডের রায়ের অপেক্ষায় ছিলাম। এখন আইনজীবির মতামত নিয়ে দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে’। ইকসিডের রায়ের বিরুদ্ধে কোন পক্ষই আপিল করেনি। যে কারণে ফিল্ডটির উন্নয়নে আর কোন বাঁধা নেই। কিন্তু পেট্রোবাংলার তড়িৎ পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান মোঃ এরফানুল হক বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, আমরা ছাতক গ্যাস ফিল্ড নিয়ে কাজ করছি। ফিল্ডটির উন্নয়ন কে করবে (বাপেক্স না-কি বিজিএফসিএল) আগে বসে ঠিক করতে হবে। আমরা শিগগিরই বসার পরিকল্পনা করছি। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৮টি গ্রাহক শ্রেণিতে অনুমোদিত লোডের পরিমাণ রয়েছে ৫ হাজার ৩৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট (দৈনিক)।এর বিপরীতে চাহিদা ৩৮০০ থেকে ৪০০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দৈনিক ২৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে, আর ঘাটতি থেকে যাচ্ছে প্রায় ১২০০ মিলিয়নের মতো। ঘাটতি সামাল দিতে কখন সার কারখানা বন্ধ, কখনও সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ, কখনও আবার বন্ধ রাখা হচ্ছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র। অন্যদিকে শিল্পে ঘাটতি লেগেই থাকছে। দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান ও উৎপাদনে ঢিলেমির কারণে আজকের এই পরিণতি বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। যদিও সম্প্রতি অনুসন্ধান ও উৎপাদন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনে পুঁঞ্জিভূত সমস্যা সমাধানের জন্য ওই উদ্যোগকে যথেষ্ট মনে করছেন না কেউই। বাপেক্সের সাবেক এমডি আমজাদ হোসেন বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, আমি মনে করি ভোলা থেকে পাইপ লাইন করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। একইসঙ্গে ইন্দোনেশিয়া যেভাবে দ্বীপগুলো থেকে ট্যাংকারে করে গ্যাস আনে সেই পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত। ট্যাংকারে করে সাঙ্গু প্ল্যার্টফর্মে নিয়ে ইনজেক্ট করবে। সাঙ্গুর অবকাঠামো ব্যবহার করে পাইপলাইনে গ্যাস যুক্ত হবে গ্রিডে। এই ট্যাংকার আমাদের দরকার, পরে যখন কতুবদিয়া এবং শ্যালোতে গ্যাস পাবো সেগুলো আনতে ট্যাংকারগুলো ব্যবহৃত হবে। ভোলা-খুলনা (ভায়া বরিশাল) পাইপলাইন করতে গেলে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। বিতর্ক রয়েছে পাইপলাইন করলে সেই টাকা উঠবে কি-না! এমন প্রশ্নের জবাবে আমজাদ হোসেন বলেন, আমি মনে করি ভোলায় কমপক্ষে ৫ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস রয়েছে, ওই এলাকায় যতগুলো কূপ খনন করা হয়েছে সবগুলোতে গ্যাস পাওয়া গেছে। ভোলা ইস্ট থেকে ভোলা নর্থের দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার সেখানে গ্যাস পাওয়া গেছে। হাতিয়া ট্র্যাপে যতগুলো কূপ করেছি, কোন মিস হয়নি, মুলাদি, বেগমগঞ্জ, সুন্দলপুর, ভোলা, সাঙ্গু সব জায়গায় গ্যাস পাওয়া গেছে। বিবিয়ানার পর এটা হবে সবচেয়ে বড় রিজার্ভ। ভোলার প্রমাণিত মজুদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৯৬৭ সালে তিতাস গ্যাস ফিল্ড যখন ঘোষণা দেওয়া হয়, তখন মজুদের পরিমাণ ছিল মাত্র ১ টিসিএফ, এখন সেখানে ৭ টিসিএফ বলা হচ্ছে। একইভাবে বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ড ২ টিসিএফ নিয়ে যাত্রা করে, ধীরে ধীরে রিজার্ভ বেড়েছে। গ্যাস ফিল্ডের মৃত্যূ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত মজুদ বলা সম্ভব না। প্রাথমিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মকবুল ই এলাহী চৌধুরীর বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, দীর্ঘদিনের পুঁঞ্জিভূত ঢিলেমির কারণে আজকে এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে যথাযথ মনোযোগ না থাকায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যুৎ ছাড়া জীবন অচল, আর বিদ্যুৎ দিতে গেলে জ্বালানি লাগবেই। কিন্তু এলএনজি আমদানি করে কোনভাবেই সামাল দেওয়া সম্ভব না। দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান আরও জোরদার করা জরুরি। SHARES অর্থ-বানিজ্য বিষয়: